আনোয়ারা আক্তার শিউলীর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প

পুলিশ কর্মকর্তা বাবার কর্মস্থল সিলেটে হওয়ায় সেখানেই জন্ম আনোয়ারা আক্তার শিউলীর । ছোটবেলা থেকেই দারুণ চটপটে ও দুরন্ত শিউলী সবসময় নিজেকে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু স্কুলের গণ্ডি না পেরোতেই বসতে হয় বিয়ের পিড়িতে। লেখাপড়া আর হয়ে ওঠে না শিউলীর। সামলাতে হয় স্বামী সন্তান সংসার। রীতিমতো বদ্ধ ঘরে বন্দী জীবন।

স্বপ্ন যার স্বাবলম্বী হওয়ার তাকে কোন কিছুদিয়েই বন্দী করা সম্ভব নয় । চটপটে ও দুরন্ত শিউলীর উদ্যমী জীবন শুরু হয় ২০০৬ সাল থেকে। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে কাপড় কিনে নিজেই ডিজাইন করে পোশাক তৈরির জন্য পাঠিয়ে দেন নানা বাড়ি জামালপুরে। তৈরি পোশাক গুলো হাতে পেয়ে পরিচিতদের  দেখাতেই তারা পছন্দ করে সেগুলো কিনে নেন। বেড়ে গেলো উৎসাহ উদ্দীপনা। শুরু হল কর্মজীবন। ছোট বোনের কাছ থেকে আরও কিছু টাকা ঋণ নিয়ে শুরু করেন বুটিকের কাজ। কেনা হয় এমব্রয়ডারি মেশিন ও সেলাই মেশিন। নিয়োগ দেয়া হয় কর্মী। বাড়তে থাকে কর্মযজ্ঞ।

সব কাজেই শুরুতে নানান বাঁধা প্রতিবন্ধকতা ও নিরুৎসাহিতকরণ পরিবেশের সম্মুখীন হতে হয়। হয়ত ভবিষ্যতে ইতিহাস লেখা হবে একারনেই প্রকৃতি এমন করে থাকে। শুধু ধৈর্য ধরে লেগে থাকতে হয়। চটপটে ও দুরন্ত শিউলীও প্রতিবন্ধকতার বাইরে নয়। খুব কাছের মানুষ গুলোর কাছ থেকে শুনতে হয়েছে নানান কটু কথা, সইতে হয়েছে মানুষিক যন্ত্রণা, কাঁদতে হয়েছে নীরবে নিভৃতে বহুদিন। তবুও দমে যাননি নিরন্তর ছুটে চলা এই সাহসী নারী উদ্যোক্তা। বাঁধা গুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আপন মনে ছুটে চলেছেন নিজ গন্তব্যে।

কেউ পাশে না থাকলেউ মায়েরা সব সময়েই সন্তানদের পাশে থাকেন। সাহস জোগান, উৎসাহ দেন, অনুপ্রাণিত করেন। শিউলী বলেন, আমার মা বরাবরই আমার কাজে উৎসাহ উদ্দীপনা জুগিয়েছেন। আমি যখন কাজ শুরু করি মা-ই আমাকে বেশী সহযোগিতা করেছিলেন। আজও আমি যখন কারখানার কাজে সারাদিনের জন্য বাসা থেকে বেড়িয়ে যাই তখন তিনিই আমার সন্তানদের আগলে রাখেন। আসলে আমার মায়ের অবদান বলে শেষ করা যাবে না।

মায়েরা এমনই হয়, এমন মায়েদের জানাই হাজারো সালাম।

কারখানায় যারা কাজ করেন তাদের শ্রমিক নয় পরিবারের একজন সদস্য হিসেবেই মনে করেন শিউলী। কর্মীদের প্রতি মাসের নির্দিষ্ট সময়ই বেতন ভাতা সহ প্রয়োজনীয় সব পাওনা মিটিয়ে দেন। ফলে তারাও সন্তুষ্ট থাকে। অধিক কাজেও কোন অনুযোগ থাকে না। শিউলী মনে করেন কর্মীর সমস্যা সংকটগুলো ইতিবাচক ভাবে দেখলেই তাদের কাছ থেকে ভালো উৎপাদন আশা করা যায়।

এত এত ব্যস্ত থাকার পরেও বিয়ের পর বন্ধ হওয়া লেখাপড়া পুনরায় চালু করেছেন শিউলী। পড়াশোনার প্রতি তীব্র টানটা হয়ত রক্তে মিশে ছিল তাই ব্যবসার পাশাপাশি আবার শুরু করেন পড়াশোনা। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন করে রেডিয়েণ্ট ইন্সটিটিউট অব ফ্যাশন ডিজাইন থেকে ডিপ্লোমা করেন। এছাড়াও কাজের সুবিধার জন্য এসএমই ফাউন্ডেশন সহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়েছেন প্রশিক্ষণ। 

কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বেশ কিছু সম্মাননা। ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ফেস অফ সিএসআর রিপোর্ট অফ গ্লোবাল একছেনচারে বিশ্বের সব গুলো দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন, ২০১২ সালে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে স্বদেশ বাংলা প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা, ২০১৫ চ্যানেল আই থেকে ভাগ্যলক্ষ্মী সম্মাননা সহ অনেক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন শিউলী।

মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে শুরু, ক্রমেই বেড়ে চলেছে ব্যবসার পরিধি। বাড়ছে পরিচিতি। বাড়ছে আয়। এতকিছু অর্জনের পেছনে শিউলীর মূল মূলধন ছিল দৃঢ় মনোবল, ধৈর্য ও সহ্য শক্তি।

শিউলী মনে করেন কাজ করার ইচ্ছাটাই মানুষকে সাফল্য এনে দিতে পারে।